বৃহস্পতিবার, ১৭ জুন ২০২১, ০১:৩১ অপরাহ্ন

কালের বিবর্তণে বিলুপ্তির পথে গ্রামীণ সংস্কৃতি লাঠিখেলা ।

পুলক সরকার / ১৫৬ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৬ মে, ২০২১, ১০:৪১ পূর্বাহ্ন

কালের বিবর্তণে বিলুপ্তির পথে গ্রামীণ সংস্কৃতি লাঠিখেলা ।

 

 

পুলক সরকারঃ

কুষ্টিয়াতে বিলুপ্তির পথে গ্রামীণ সংস্কৃতির একটি অংশ লাঠি খেলা। ঐতিহ্যবাহী এই খেলাটি এখনো বেশ জনপ্রিয়। আবহমানকাল ধরে কুষ্টিয়াসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলায় এক সময় বিনোদনের খোরাক জুগিয়েছে লাঠি খেলা। কিন্তু কালের বিবর্তণে মানুষ আজ ভুলতে বসেছে এই খেলাটি।

লাঠি খেলা একটি ঐতিহ্যগত মার্শাল আর্ট যেটি বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কিছু জায়গায় চর্চা করা হত। মূলতঃ মার্শাল আর্ট আর লাঠি এই দুইয়ের সংমিশ্রন ও এর মধ্যে ঢোলের অনুপ্রবেশই এটাকে খেলায় রূপান্তরিত করেছে।লাঠি খেলা’ অনুশীলন কারীকে ‘লাঠিয়াল’ বলা হয়।

বাদ্যের তালে নেচে নেচে লাঠি খেলে অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করে লাঠিয়ালরা। ঢাক, ঢোল আর কাঁসার ঘন্টার শব্দে চারপাশ উৎসব মুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অন্য দিকে প্রতিপক্ষের হাত থেকে আত্মরক্ষার কৌশল অবলম্বনের প্রচেষ্টা সম্বলিত টান টান উত্তেজনার একটি খেলার নাম লাঠি খেলা। লাঠি খেলা অনুশীলনকারীকে লাঠিয়াল বলা হয়। এই খেলার জন্য লাঠি সাড়ে চার থেকে পাঁচ ফুট লম্বা, তবে প্রায় তৈলাক্ত হয়। প্রত্যেক খেলোয়ার তাদের নিজ নিজ লাঠি দিয়ে রণকৌশল প্রদর্শন করে।

লাঠিখেলায় লাঠিয়ালরা চালায় লাঠির কসরত। প্রতিপক্ষের লাঠির আঘাত থেকে নিজেকে রক্ষা ও তাকে আঘাত করতে ঝাঁপিয়ে পড়েন লাঠিয়ালরা। এসব দৃশ্য দেখে লাঠিখেলায় আগত দর্শকরাও করতালির মাধ্যমে উৎসাহ যোগায় খেলোয়াড়দের।

এ খেলাটি দিন দিন বিলুপ্তি হওয়ার কারণে এর খেলোয়ার সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে না কোন নতুন খেলোয়ার। তবে হারিয়ে যাওয়া এই ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দাবি দর্শদের।

গ্রামের সাধারণ মানুষেরা তাদের নৈমিত্তিক জীবনের উৎসব উপলক্ষে লাঠি খেলার আয়োজন করতেন। এক্ষেত্রে সাধারণত কোনও লাঠিয়াল দলকে ভাড়া করে আনা হয়। বিগত দশকেও গ্রামাঞ্চলের লাঠি খেলা বেশ আনন্দের খোরাক জুগিয়েছে। সাধারণ মানুষের হূদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছিল এ খেলাটি। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসত লাঠিখেলা দেখার জন্য। বিভিন্ন জায়গায় মাঝে মধ্যে এই খেলা দেখা গেলেও তা খুবই সীমিত।

বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ লোকজ খেলা গুলোর মধ্যে কুতকুত, কড়ি খেলা, লুডু, সাত চারা, ধাপ্পা, রস-কস, ঘুড়ি ওড়ানো, পাশা খেলা, গোল্লাছুট, বউচি, এক্কাদোক্কা, এচিং বিচিং, কানামাছি, দাড়িয়াবান্ধা, মার্বেল খেলা, লাটিম খেলা, ষোল গুটি, কাবাডি, নুনতা খেলা, পুতুল খেলা, চড়ুইভাতি, ব্যাঙের বিয়ে, লাঠি খেলা, মোরগ লড়াই, ষাঁড়ের লড়াই, ঘোড়া দৌড়, নৌকা বাইচ, কুস্তি, ভলি খেলা প্রভৃতি হচ্ছে উল্লেখযোগ্য। এইসব খেলা এক সময় অনেক বহুল প্রচলিত ও জনপ্রিয় ছিল। এছাড়াও আরো অনেক গ্রামীণ লোকজ খেলা আছে। বর্তমানে এইসব খেলার চর্চা না থাকার কারণে অধিকাংশ খেলা এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।

বই পুস্তকে বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী লোকজ খেলা গুলোর নাম পাওয়া যায় কিন্তু চর্চা নেই। সত্যি কথা বলতে, আমাদের ঐতিহ্যবাহী লোকজ খেলা গুলো নিয়ে কারো তেমন আগ্রহ নেই।

আধুনিক প্রযুক্তির কম্পিউটার বা মোবাইল গেমস ও দেশে প্রচলিত বিদেশি খেলাগুলো থেকেও অনেক বেশি মজার খেলা হচ্ছে আমাদের ঐতিহ্যবাহী লোকজ খেলা। কিন্তু সময়ের পথ ধরে আজ তা অতীতের ধূসর স্মৃতি।

বর্তমানে আমাদের নতুন প্রজন্ম ঘরে বসে প্রযুক্তির আধুনিক খেলা খেলে ও কার্টুন দেখে বিনোদন করে। গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী লোকজ খেলার সাথে তাদের কোন সম্পৃক্ততা নেই। অধিকাংশ শহুরে বাচ্চারা এইসব খেলার নাম পর্যন্ত জানে না। গ্রামের বাচ্চারাও শহুরে বাচ্চাদের মতোই প্রযুক্তির আধুনিক খেলা নিয়ে ব্যস্ত। তারাও এখন লোকজ খেলা গুলো থেকে বহু দূরে সরে গেছে। যদি এভাবেই চলতে থাকে, অদূর ভবিষ্যতে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী লোকজ খেলা গুলো বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

জেলার খোকসা উপজেলার মতিয়ারের বয়স এখন ৭০ এর কোঠায়। তিনি জানালেন, এলাকায় দুই জন লাঠি খেলার ওস্তাদ ছিলেন। তাদের কাছ থেকেই মাত্র ১১/১২ বয়সেই এই লাঠি খেলা শিখেছেন। ১২/১৪ বছর আগেই তাদের সাথে আগে লাঠি খেলাগুলো জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে খেলে থাকতেন। সময়ের ব্যবধানে কৃষিকাজের সাথে যুক্ত হয়ে যান তিনি।

খোকসা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেজবাহ উদ্দীন জানান, দেশীয় সংস্কৃতি ধরে রাখতে বর্তমান সরকার বেশ আন্তরিক। তবে শুধু সরকার নয় সরকারের পাশাপাশি সামাজিক সংগঠন, বেসরকারি সংস্থা এবং তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর ....

Archives

MonTueWedThuFriSatSun
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930    
       
     12
17181920212223
31      
   1234
19202122232425
2627282930  
       
22232425262728
293031    
       
       
       
      1
30      
   1234
       
282930    
       
  12345
6789101112
13141516171819
2728293031  
       

এক ক্লিকে বিভাগের খবর
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect. Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.